আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জানতে এবং জানাতে দেশের প্রান্তে প্রান্তে গিয়ে আমরা ইত্যাদি ধারণ করি। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ মে প্রচারিতব্য অনুষ্ঠানটি দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত, অসংখ্য সাধক কবির জন্ম ও বিচরণে ধন্য এবং জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-কীর্তিমান ব্যক্তিদের স্মৃতিধন্য অনন্য জেলা ঝিনাইদহে ধারণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধারণ তারিখ ছিল গত ১৭ মে। ধারণস্থান হিসাবে নির্বাচন করা হয়েছিল এশিয়ার বৃহত্তম কৃষি খামার মহেশপুরের দত্তনগরের দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের মাঝখানে বটবৃক্ষ চত্বরকে। যেখানে লক্ষাধিক দর্শক অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন। অনুষ্ঠান ধারণ উপলক্ষে পুরো ঝিনাইদহ জুড়েই ছিল উৎসবের আমেজ।
উল্লেখ্য ইত্যাদি দেখার জন্য বিশেষ পাশ দেয়া হয়-বিতরণ করেন জেলা প্রশাসন কিংবা উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী সবাই ইত্যাদি ধারণে সহযোগিতা করেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইত্যাদি ধারণের উপযুক্ত সময় হচ্ছে শীতকাল। বর্ষাকালে এসব অঞ্চলে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে বৃষ্টি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ধারণের ৪/৫ দিন আগেই আমরা নিয়মিত একজন আবহাওয়াবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তার দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী ১৭ তারিখে বৃষ্টিমুক্ত আবহাওয়া ছিল। তবে তিনি জানান, কালবৈশাখী ঝড় সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। এ সময় হঠাৎ করে যে কোন দিন কোন সেল বা মেঘের কুণ্ডলী তৈরি হয়ে-তা থেকেই যে কোন সময় ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। আর সেই হঠাৎ সৃৃষ্ট ঝড়ের কবলেই পড়েছিল এবারের ইত্যাদি। সারাদিন রৌদ্রোজ্জ্বল থাকলেও সন্ধ্যা থেকেই ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে শুরু হয় কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কখনও ভারি বৃষ্টি, সাথে ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাত।
আশেপাশে কোন বাড়ি-ঘর না থাকায় বটগাছটিই ছিল একমাত্র আশ্রয়স্থল। রাস্তায় দর্শকদের ভিড়ের কারণে শিল্পীদের নিয়ে ছয়টায় যাত্রা শুরু করে দুই কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে বেজে যায় রাত আটটা। ততক্ষণে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইত্যাদি হবে না ভেবে হাজার হাজার দর্শক বৃষ্টিতে ভিজেই ফিরে গেছেন। তাদের জন্য আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছি।
অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে দেখি পুরো স্থানটি কর্দমাক্ত। আমাদের লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, সেট সবকিছুই বৃষ্টির পানিতে ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুইদিন ধরে নির্মাণ করা সেটের করুণ অবস্থা দেখে ভীষণ খারাপ লাগছিল। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছে শতাধিক কর্মী। বৃষ্টির তাণ্ডবে পুরো স্থানটিই বিপর্যস্ত। সবাই হতাশ। গত ৩৭ বছরে ইত্যাদি এই প্রথম এমনি বিপর্যয়ের মুখে পড়লো। এর আগেও আমরা যশোর, পাবনা, সিলেট, কুমিল্লায় অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কবলে পড়েছিলাম কিন্তু অনুষ্ঠান ধারণ সম্ভব হয়েছিল।
আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেই-যে করেই হোক এখানেও অনুষ্ঠান করতে হবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চেয়ারগুলোকে পরিষ্কার করে যথাস্থানে বসানো হলো। তিন সেট সাউন্ডের এক সেট মেরামত করা হল। ব্যবহার উপযোগী অল্প সংখ্যক লাইট দিয়েই ধারণ পরিকল্পনা করা হল। তাৎক্ষণিকভাবে তিনটি কর্কশিটে ইত্যাদি লিখে বটগাছে ঝুলিয়ে দেয়া হল। এসব করতে করতেই বেজে গেলো রাত বারোটা। সীমিত সুবিধা দিয়ে মনোবলকে পুঁজি করে শুটিং করার জন্য প্রস্তুত হলাম। লাইট জ্বললো, মাইক্রোফোন টেস্ট হলো, মধ্যরাতে যেন আবার জেগে উঠলো মাঠের মধ্যে বটগাছ চত্বর। কোথা থেকে যেন রাতের অন্ধকার, কর্দমাক্ত রাস্তা পার হয়ে শত শত দর্শক ছুটে এলেন। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে নিমিষেই সারাদিনের ক্লান্তি-অবসাদ দূর হয়ে গেল।
দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত করতালির মধ্য দিয়ে বৃষ্টি বাধাকে পরাজিত করে ধারণ শুরু করলাম ইত্যাদি। সকালের আলো ফোটার আগেই শেষ হলো ধারণ। দর্শকদের দেখে মনে হলো আরো কিছুক্ষণ ধারণ হলেও তারা থাকতেন। উপভোগ করতেন ইত্যাদির ধারণ অনুষ্ঠান। যারা মধ্যরাতে এই বৃষ্টি ভেজা কর্দমাক্ত চত্বরে এসে ভোররাত পর্যন্ত অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন তাদের প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা। ইত্যাদির প্রতি দর্শকদের এই ভালোবাসাই আমাকে এখনও ইত্যাদি করতে উৎসাহিত করে। যে ভালোবাসার কারণে বৃষ্টিও থামিয়ে রাখতে পারেনি ইত্যাদির ধারণ।





